নিজের ভুলগুলো স্বীকার করতে শেখ- স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে টিম কুক

0

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এর যেন এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।আজ থেকে চৌদ্দ বছর আগে স্টিভ জবস এখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।হ্যাঁ, এটিই সেই স্থান যেটি তথ্য প্রযুক্তি জগতের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত। এটি সেই স্যালিকন ভ্যালি। আগে যেমন ছিল,এখনো আছে এবং আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে।

“জীবন ক্ষণকালের। তাই অন্যের অনুকরণ করতে গিয়ে সময় পার করে দিয়ো না” স্টিভ জবসের কথা স্মরণ কর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে টিম কুকের মহামূল্যবান বক্তব্য

স্ট্যানফোর্ড ও প্রযুক্তি

ছবিঃ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি (সংগৃহীত)

কয়েক প্রজন্ম ধরে স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে নানাভাবে কাজে লাগিয়ে আসছে। এদের উদ্দেশ্য সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। যাদের মধ্যে স্নাতক, মাঝ পথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিক্ষার্থীরা ও কাজ করছে এক সাথে । সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কিছু নৈতিক বিপর্যয় নেমে আসায়।

প্রযুক্তির ওপর থেকে অনেকের আস্থা উঠে যাওয়া। এবং মানুষ আমাদের মূল্যবোধের দিকে আঙুল তুলে এত কিছুর পরও প্রযুক্তি আমাদের টানে। এবং তা আমাদের ভালোর জন্যই।

ছবিঃ সংগৃহীত

স্ট্যানফোর্ড তাদের বড় স্বপ্ন দেখায়। অন্যদিকে মেধাবী
ও অনুরাগীরা ,সেই স্বপ্ন পূরণে । লেগে পড়ে। এই নৈরাশ্যবাদ যুগে স্ট্যানফোর্ড বেশ আশাবাদী।কারণ তারা জানে, মানুষ হিসেবে আমাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অসীম।

আবার এ-ও সত্যি যে,মানুষ হিসাবে সমস্যা সৃষ্টি করতে আমরা পারদর্শী। আমি আজ এসব বিষয় নিয়েই কথা বলব। কারণ, এত দিনে আমি জেনেছি, প্রযুক্তি আমাদের বদলায় না বরং তা আমাদের ভেতরের ভালাে বা মন্দকে কয়েক শ গুণ বাড়িয়ে দেয়।

কয়েক প্রজন্ম ধরে স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে নানাভাবে কাজে লাগিয়ে আসছে। এদের উদ্দেশ্য সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। যাদের মধ্যে স্নাতক, মাঝ পথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিক্ষার্থীরা ও কাজ করছে এক সাথে । সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কিছু নৈতিক বিপর্যয় নেমে আসায়। প্রযুক্তির ওপর থেকে অনেকের আস্থা উঠে যাওয়া। এবং মানুষ আমাদের মূল্যবোধের দিকে আঙুল তুলে এত কিছুর পরও প্রযুক্তি আমাদের টানে। এবং তা আমাদের ভালোর জন্যই।

নিজের ভুলগুলো স্বীকার করতে শেখ

“প্রযুক্তি বা রাজনীতি যেকোনো ক্ষেত্রে আজ যত বিপর্যয় ঘটছে, সবই মানবসৃষ্ট।”
“তোমাদের জন্য আমার প্রথম উপদেশ—ভালো কাজের জন্য সুনাম চাও? তাহলে নিজের ভুলগুলো স্বীকার করতে শেখ।

“প্রথম দোল উদ্ভাবন থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত এ, যাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ সব আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের গোড়াপত্তন এই সিলিকন ভ্যালিতে।”

‘তোমার গুরু তার জীবদ্দশায় হয়তো তোমাকে যে কোন কিছুর জন্য প্রস্তুত করে যেতে পারবেন। যা তিনি পারবেন না, তা হলাে আকস্মিক কোনাে ঘটনা সামাল দিতে পারো, তা তোমায় নিজেকে শিখতে হবে।’

টিম কুক

আবার সামাজিক যোগাযােগ মাধ্যমগুলাে, শেয়ার করা, ভিডিও, স্টোরিজ কিংবা স্ন্যাপস ইত্যাদি ভার্চ্যুয়াল জগতের যে উপাত্ত গুলো আজ গোটা বিশ্বকে সংযুক্ত করে রেখেছে, তার প্রায় সবকিছুর সূচনাও এই স্ট্যানফোর্ড প্রাঙ্গণেই। তবে কিছুদিন হলো প্রযুক্তি শিল্পের সেই সুনাম আর নেই। এখানে কর্মরতঅনেকেই আছে, যারা কৃতিত্ব নিতে সিদ্ধহস্ত কিন্তু নিজেদের গাফিলতির দায়িত্ব নিতে নারাজ।

হ্যাক হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য

প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা অনলাইনে ডেটাবেজ থেকে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হচ্ছে, গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের হিংসাত্মক মন্তব্যে প্রতিবাদ করছে না কেউ। মিথ্যে খবর উঠে আসলে রাষ্ট্রীয় আলোচনায় এখন অনেকেই মনে করেন, উদ্দেশ্য ভালো হলে কাজের ফলাফল ক্ষতিকর হলেও তা ক্ষমার অযোগ্য!অথচ যদি তোমার দোষে কোনো নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়, তাহলে তা সামাল দেওয়ার দায়ভার যে তোমার।

এই সহজ কথাটা কখন বলতে হবে ভাবিনি। নিজের ভুলের দায়িত্ব নিতে পারাই হলো বিচক্ষণতা। এর জন্য সাহসের প্রয়োজন।

বাজার ধরে কেনাবেচা হয় মুহূর্তে যেকারও ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাক হয়ে যায়, গোপনীয়তা ফাঁস হয়। যদি ধরে নেই এটাই স্বাভাবিক—এসব এড়ানোর কোনো পথ নেই, তাহলে আমরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই নয়, আরও বড় কিছু হারাতে চলেছি। তা হচ্ছে মনুষ্যত্ব। আমরা আর মানুষ থাকব না। আমাদের সে স্বাধীনতা টুকু ও হারিয়ে যাবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা

ধরো, আমরা এমন জগতে বাস করি, যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা নেই। সেখানে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতেই পারে। এ তাে কোনাে অন্যায় নয়! এরপর তুমি নিজেকে গুটিতে শুরু করবে।

ভাবনা ও বক্তব্যে লাগাম আঁটতে চাইবে। কেন জানো? নিরাপত্তার ভয়ে। ধীরে ধীরে তুমি আশা কমিয়ে দেবে, কল্পনায় বেড় দেবে। ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে, উদ্যম কমে যাবে। সৃজনশীলতা, ভাবপ্রকাশ এমনকি চিন্তাভাবনা দমিয়ে রাখতে শুরু করবে।

এই হলো ডিজিটাল নজরদারি ভয়াবহ পরিণতি! এর প্রভাব সর্বগ্রাসী! ভাবতে পারো, তখন জগৎ কতটি ক্ষুদ্র হয়ে যাবে? যেখানে কল্পনার অস্তিত্ব থাকবে না। নাহ, সে জগৎ আমাদের জন্য নয়! আমরা আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।

স্বাধীনতা মানে কী?

যে সমাজে বড় বড় ভাবনা শিকড় গাড়তে পারে,যেখানে ভাবনাগুলাে লালন করার সুযোগ আছে, যেখানে যৌক্তিক বিধিনিষেধ নেই। আমরা যদি তা বিশ্বাস করি, তাহলে এমন আমাদের চিন্তাভাবনা ও আচরণ বদলাতে হবে।

কারণ, আগের প্রজন্মের মতাে তোমাদের নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ থাকা চাই। প্রিয় স্নাতকেরা, বর্তমানের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নাও। যদি ভালো কাজের জন্য বাহবা পেতে চাও, তো দায়িত্ব নিতে শেখ।

টিম কুক স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিলেন যে

আমার সর্বশেষ উপদেশ “যে কোন ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। চৌদ্দ বছর আগে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্টিভ জবস বলেছিলেন, ‘জীবন ক্ষণকালের। তাই অন্যের অনুকরণ করতে গিয়ে সময় পার করে দিয়ো না। এর সঙ্গে আমি কিছু যোগ করতে চাই,

‘তোমার গুরু তার জীবদ্দশায় হয়তো তোমাকে যে কোন কিছুর জন্য প্রস্তুত করে যেতে পারবেন। যা তিনি পারবেন না, তা হলাে আকস্মিক কোনাে ঘটনা সামাল দিতে পারো, তা তোমায় নিজেকে শিখতে হবে।’

এ নিয়ে আমার এক অভিজ্ঞতা আছে। জীবনের শেষ দিকে গঠিত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমার কিন্তু তখনাে বিশ্বাস, তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আগের মতাে কাজে লেগে যাবেন। আজীবন পথ দেখিয়ে যাবেন অ্যাপল কোম্পানি। একদিন হয়তো আমি থাকব না। কিন্তু তিনি থাকবেন চিরকাল।

আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো,মারা গেলেন স্টিভ জবস

আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো,মারা গেলেন স্টিভ জবস। এর থেকে আমি যা শিখলাম, তা হলে পূতি থাকলেও প্রত্যুৎপন্নমতি হওয়া সহজ নয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য ।

স্টিভের মৃত্যুর পর আমি একা হয়ে পড়লাম। জীবনে কখনো নিঃসঙ্গ বোধ করিনি। যেমন মাঝেমাঝে বড় কোনো ধাক্কা পেলে আশপাশে লোকের ভিডিও কারো কথা কানে যায় না, কারও দিকে খেয়াল থাকে না। সৰ অনুভূতি ভোতা হয়ে যায়। আমার সে অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে আমি বুঝতে পারতাম, সবাই এখন আমার মুখ চেয়ে আছে।

নিজেকে অন্যের ছাঁচে ফেলতে যেয়ো না

অবশেষে শোক কাটিয়ে উঠলাম। বুঝলাম, অন্যের মতো হতে না চেয়ে, আমাকে এখন নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে যেতে হবে। নিজেকে বোঝাতাম,অন্যের চাওয়া মতো জীবনের কলকবজা ঘোরাতে আমি চাই না। তোমাদেরও বলব, নিজেকে অন্যের ছাঁচে ফেলতে যেয়ো না। এতে শরীর ও মনে চাপ পড়বে। সেই শ্রম দিয়ে বরং নিজের জীবন নিজেই সাজাও।

আরেকটা জিনিস মনে রাখবে, সবার জীবনে সুযোগ আশে। হয়তো সে সময় তুমি প্রস্তুত না-ও থাকতে পারো। তোমার কাছে তা চাওয়াও হচ্ছে না। শুধু মনোবল ধরে রাখতে শেখো। অপ্রত্যাশিত ঘটনার ভেতর থেকেও আশা খুঁজে নাও। একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখ। পথে একা হয়ে পড়লে ও নিজের স্বপ্ন অটুট রাখ।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে

পথ বিচ্যুত হলে চলবে না। অনেকে অযথা বাহবা পেতে চায়।এমন সব কাজে যার পেছনে তাদের অবদান নিতান্ত কম অথবা নেই বললেই চলে। এদের চেয়ে ভিন্ন হতে হবে। পৃথিবীতে দাগ কেটে যেতে হবে। তুমি মৃত্যুর সঙ্গে সবকিছু নিয়ে যেতে পারবে না। তোমাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here